২০২৫ সালের শেষভাগে বাংলাদেশের পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা পেলেন এক নতুন চেহারা। দীর্ঘদিনের চেনা নীল-সবুজ পোশাক সরিয়ে তাঁদের গায়ে উঠেছে নতুন ‘আয়রন-গ্রে’ বা ধূসর রঙের ইউনিফর্ম। আধুনিকতা, পেশাদারিত্ব এবং বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধির সরকারি দাবি নিয়ে এই পরিবর্তন এলেও, দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা, সমালোচনা এবং গুরুতর প্রশ্ন।
কিন্তু বাস্তবিক প্রশ্ন হলো—একটি 'কারেকশন' ছাড়াই কেবল বাহ্যিক পরিবর্তনের এই পদক্ষেপ কি বাহিনীর মূল সংকট ঢাকতে পারে?
কেন এই পরিবর্তন? (সরকারি ভাষ্য বনাম বাস্তবিকতা)
সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই রং বদলের উদ্দেশ্যকে ত্রিমুখী বলে উল্লেখ করা হয়েছে:
- আধুনিক ইমেজ: আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাহিনীকে আরও আধুনিক রূপে তুলে ধরা।
- অধিক পেশাদারিত্ব: সদস্যদের মধ্যে পেশাদারিত্বের অনুভূতি জোরদার করা।
- মানসিক শক্তি বৃদ্ধি: নতুন পোশাকে বাহিনীর সদস্যদের মানসিক শক্তি ও মনোবল বাড়ানো।
কিন্তু জনগণের বড় একটি অংশের কাছে, এই পরিবর্তন নিছকই এক প্রকার ‘পাবলিক রিলেশন্স’ উদ্যোগ ছাড়া আর কিছুই নয়। আসল প্রশ্নটি হলো—যেখানে ব্যবস্থার সংস্কার দরকার, সেখানে কেন কেবল বাইরের রং বদলানো হলো?
সংস্কারের নামে ছলচাতুরি?
যখন আমরা বিশ্বের দিকে তাকাই, তখন সংস্কারের প্রকৃত চিত্র দেখতে পাই। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে আন্দোলনের পর পুলিশের মূল লক্ষ্যে ছিল কার্যকর, গঠনমূলক পরিবর্তন:
- শরীরের ক্যামেরা (Body Cams) চালু
- আচরণবিধি কঠোর করা
- চোক-হোল্ড (Choke-hold) নিষিদ্ধ করা
সেখানে ইউনিফর্মের রং পরিবর্তন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি; প্রধান লক্ষ্য ছিল জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং কার্যকর পরিবর্তন আনা।
অথচ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি বিপরীত। ইউনিফর্ম বদলানো হয়েছে, কিন্তু কাঠামোগত সংস্কারের পথে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই:
- আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে কোনো নবায়ন আসেনি।
- মানবাধিকার সম্প্রসারণ বা ঘুষ-দমনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, এই নতুন পোশাকের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকার কেনাকাটার ভার্জিন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে—পরিচালন প্রক্রিয়া রয়ে গেছে আগের মতোই অস্বচ্ছ।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া: 'টাকা মারার ধান্দা'
সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের অব্যবস্থাপনার শিকার, তারা এই পরিবর্তনকে ভালোভাবে নেননি। সামাজিক মাধ্যম ও জনপরিসরে তীব্র সমালোচনা ছড়িয়ে পড়েছে:
❝পোশাক বদল খালি টাকা মারার ধান্দা; জনগণের নিরাপত্তা, জবাবদিহিতা, বা মানবাধিকারের কোনো উন্নয়ন হলো না।❞
❝যে বাহিনীর ব্যবস্থাগত শুদ্ধতা দরকার ছিল, সেখানে শুধু বাইরে রঙের পালিশ জরিপের চেয়েও হাস্যকর।❞
এই বিশাল কেনাকাটার ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছতা নেই, যা সংশ্লিষ্ট মহলের আর্থিক সুবিধা লাভের সুযোগ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জনগণের চোখে, এটি সরকারি অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
ইউনিফর্ম নয়, চাই মনমানসিকতার পরিবর্তন
পোশাক বদলের মতো বাহ্যিক পরিবর্তন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মর্যাদা 'চকমকে' উঠবে না—যতক্ষণ না বাহিনীর প্রকৃত জবাবদিহিতা, নীতিগত শুদ্ধতা ও মানবাধিকারের সংস্কার হয়।
বর্তমানে দেশে যেটা দরকার ছিল, তা হলো—প্রশাসনিক ও মনমানসিকতার সংস্কার। অথচ, এখন সেটা না পেয়ে উল্টে নতুন পোশাক বদলের নামে উদারহস্তে সরকারি টাকা খরচের ধুম চলছে। জনগণের প্রশ্ন সহজ: পোশাকের রং বদলে যদি বাহিনীর চরিত্র না বদলায়, তবে এই খরচ কেন?
No comments:
Post a Comment